দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন ঘোষণার পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। ইরান বলেছে, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার এ উদ্যোগ জাতিসংঘের প্রতিটি স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রের ওপর বহির্বিশ্বে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি এবং এর কোনো ভিত্তি আন্তর্জাতিক আইনে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী সোমবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় এক সংবাদ সম্মেলন করবেন। এর আগে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
বেসেন্ট চীনের কাছেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনে চীন। তবে বেইজিং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাঈ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা জাতিসংঘের প্রতিটি স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ‘বহির্বিশ্বে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি’।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের গৌণ নিষেধাজ্ঞার আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই।’
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাঈ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা দেশগুলোর স্বার্থেও আঘাত হানবে তেহরান।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশপাশের সব দেশকে বলছি, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেয়। অন্যথায় আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি গোলাগুলি না হলেও শান্তি আলোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে অনুমতি ছাড়া চলাচলের চেষ্টা করা যেকোনো তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এমনিতেই তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে ইরানের অর্থনীতি।
ইরানের জাহাজগুলোকে বন্দরে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েছে শত শত জাহাজের হাজারো নাবিক। জাহাজ চলাচলবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। এর একটিও বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকার ছিল না।
তবে বাগদাদের বারবার অনুরোধের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ইরাক সফরে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে আলোচনায় ইরাকি ট্যাংকারগুলোর জন্য বিশেষ অনুমতি নেওয়া ছিল বাগদাদের অন্যতম প্রধান দাবি।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে গত সাত দিনে গড়ে প্রতিদিন ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ কোটির বেশি ব্যারেল, যা বিশ্বে ব্যবহৃত প্রতি পাঁচ ব্যারেল তেলের প্রায় এক ব্যারেলের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির নৌ ও বিমানবাহিনীও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে তেহরানের কাছে এখনো তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলা চালানোর মতো যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুল্লাহি শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি দেশের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘এই কারখানা অতীতের চেয়ে অনেক ভালোভাবে সক্ষমতা, গুণগত মান ও পরিমাণে উন্নততর সরঞ্জাম উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।’
পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ বলেন, নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তেহরান ‘অসংখ্য বার্তা’ পেয়েছে। তবে তিনি কোন কোন দেশের কথা বলছেন, তা উল্লেখ করেননি।
ইসরায়েলের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে অভিযোগ করেন গালিবাফ। তার মতে, স্বাধীন ও ‘নিজস্ব শক্তিতে গড়ে ওঠা’ একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে তারা তা করতে চাইবে, তবে তার মতে, তেহরান এখনো ‘সঠিক চুক্তি’ করার জন্য প্রস্তুত নয়।
তিনি বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী হবে, কিন্তু আমার মতে, তারা এখনো সঠিক চুক্তি করার জন্য প্রস্তুত নয়।’
যুদ্ধের শুরুতে নির্ধারিত কয়েকটি লক্ষ্য এখনো অর্জন করতে পারেননি ট্রাম্প। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া। জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা ২০২৫ সাল থেকে ইরানে প্রবেশ করতে না পারায় ওই কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে দেশটির জনগণের অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্যও পূরণ হয়নি।
যুদ্ধে প্রধানত ইরানেই হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের ১৬৮ জন স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৭৫০ জনের বেশি সামরিক সদস্য আহত এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন।
তবে ইরান এখনো কঠোর অবস্থানে থাকলেও দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আজই যুদ্ধ শেষ করা ভালো হবে, যখন আমরা শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আছি এবং পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করছে। একই সঙ্গে বিশ্ব জোর দিয়ে বলছে, সব নিয়মের পরিপন্থী হয়ে আমেরিকা আমাদের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে।’
/অ